এক.
এশার পর থেকে চন্দনপুরে হালকা শীতল সমীরণ বয়ে যাচ্ছে। চারপাশে কিছুটা শান্তিদায়ক নীরবতা ছেয়ে আছে। আকাশে মস্ত বড় চাঁদ। এটা চন্দনপুরের অন্যতম একটা বৈচিত্র্য। এখানে রুপোলী চাঁদ জেগে উঠে সন্ধ্যারাতেই। চাঁদের আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আকাশ মেঘমুক্ত হওয়ায় পৃথিবীর সাথে চাঁদের খুনসুটি একটু বেশীই বলা চলে। অপূর্ব শান্ত প্রকৃতি জোছনার আলো-আঁধারিতে কেমন যেন রহস্যঘন রূপ।
যখন এই প্রকৃতি দেখেছিলাম তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, এখনো ফেরার নামগন্ধও নেই। তখন পড়াশোনা একেবারেই করতাম না। সারাদিন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। তারা অবশ্য আছরের আগেই যার যার বাড়ি চলে যেতো। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরতাম এশার পর। বাড়ির সবাই এ নিয়ে অনেক বকাঝকা করেছে। জুতাপেটাও করেছে কয়েকদিন। কিন্তু পরে পরিবর্তনের কোন ছোঁয়া না পেয়ে সবাই বরারবরের মতোই হতাশ। এখন তেমন কিছু বলে না, তারা এটাকে খুবই স্বাভাবিক মনে করে নিয়েছে। এবং ধরেই নেয়, রাত নয়টার পর বাড়ি ফিরব।
পড়াশোনা করতাম না বললেই চলে। কারণ আমার অংক ম্যাডাম ছিলেন আমার ছোট চাচ্চুর খুবই ক্লোজ ফ্রেন্ড। চাচ্চু সবেমাত্র গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করেছে। আরো কি কি নাকি পড়বে, তারপর বিবাহ। তাই ম্যাডামের অন্যতম দায়িত্ব ছিল পরীক্ষার আগে সুন্দর করে আমার বইয়ে প্রশ্নগুলো দাগিয়ে দেওয়া। তা না হলে তাদের সম্পর্কের কথা বাড়িতে জানিয়ে দেওয়ার মতো হুমকি প্রায় প্রতি পরীক্ষার সময়ই দেওয়া লাগতো। ম্যাডামও দাগিয়ে দিতে সংকোচবোধ করতেন না। ক্লাসে সবাইকে পড়া ধরলেও আমার বেলায় ভয়ে থাকতেন। কিছু খেতে ইচ্ছে হলে ম্যাডামকে বললেই হতো, তিনি টাকা না থাকলে ধার করে হলেও আমায় কিনে দিতেন। মাঝেমধ্যে না চাইতেও তিনি এটা সেটা এনে খাইয়ে দিতেন। ঈদের সময় বাবা জামা কিনে না দিলেও ম্যাডাম একটা জামা অবশ্যই দিবেন, সে আশায়ই থাকতাম। আমিও ম্যাডামকে খুবই শ্রদ্ধাভরে কথাবার্তা বলতাম।
দুই.
বাবা তখন ডাকপিয়নের চাকরি করতেন। রোজ রোজ সাইকেলের প্যাডেল মারতে মারতে তাঁর জীবন শেষ। কপালে ঘাম নিয়ে তিনি প্রতিদিন বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু তিনি আমাকে তেমন কিছুই বলতেন না। মাঝেমধ্যে চিঠি বিলি করতে যাওয়ার সময় পথে-ঘাটে তাঁর চোখে পড়ে গেলে তিনি মুচকি হাসতেন। সেই হাসিতে আমার মন ভরে উঠতো। কিন্তু তেমন একটা শাসন করতেন না। ক্লাসের প্রথম ছাত্র, বিধায় মনে হতো তিনিও আমাকে খানিকটা স্নেহ করেন। স্কুলের টিচাররা বাবার কাছে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। বিশেষ করে অংক ম্যাডাম তিলের সাথে তাল মিলিয়ে বাবাকে গুলে খাওয়াতেন।
একদিন বাবা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলেন। সেদিন প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেলাম। বাবাকে কোনদিন কাঁদতে দেখিনি। আজ হঠাৎ তাঁর চোখে পানি। মা-ও এগিয়ে এলেন। আমাদের দেখাদেখি বাড়ির সবাই প্রায় জড়ো হলো। তখনকার সময়ে এক বাড়িতে আমরা বহু মানুষ থাকতাম। তাই সামান্য কিছু হলেও সবাই এগিয়ে আসত। এখন অবশ্য একসাথে কেউ নেই। আগে দেখতাম, কাকিমারা রান্না করতো, আর দাদা-দাদু সেখান থেকে খেতো। এখন কাকিমাদের অভাবে দাদা-দাদুও রান্না করে খান। প্রায় সবাই এখন শহরে ফ্লাট কিনে ফেলেছে। কেউ জায়গা কিনে সুখের সংসার করছে। শশুর-শাশুড়ীকে মনে হয় সবাইই কমবেশী ঝামেলা মনে করে।
হঠাৎ দেখলাম মায়ের চোখেও পানি। এবার মনটা অস্থির হয়ে উঠল। একটানে চিঠিটা হাতে নিলাম। চিঠিতে লেখা প্রেরক জুঁই, চন্দনপুর/প্রাপক মরহুমা তানিয়া খাতুন, চন্দনপুর কবরস্থান। ওর মায়ের কাছে চিঠি লিখেছে জুঁই।
আমিও সেদিন কেঁদেছিলাম। মায়ের কষ্টে কেঁদেছিলেন বাবাও। সেই গল্পে আজও তিনি কাঁদেন। তবে জুঁই, সে এখন দুই মেয়ের জননী। মেয়েগুলো খুবই দুষ্ট। কথায় কথায় শুধু ভেংচি কাটে।
সমাপ্ত
