মাহিরের দিনগুলো কাটে একটি মেয়ে ময়নার সঙ্গে কথা বলে। ময়নার গায়ের রংটা বেশ অদ্ভুত লাগে তার কাছে। কিছুটা কৃষ্ণবর্ণের হলেও তার ঝকঝকে শরীর দেখে সে অভিভূত। ময়নাটির দিকে তাকালে চোখটা কেমন যেন ঝলসে যায়। মনে চায় আরো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিই। তার সৌন্দর্যকে অনুভব করি। ময়নাপাখিও যে মানুষের মতো করে কথা বলতে পারে। এটা আগে কখনো জানা ছিল না তার। মাহিরের বাবা যেদিন পাখিটিকে ঘরে আশ্রয় দিয়েছিল। সেদিনই সে ভেবেছিল। পাখিটিকে ছেড়ে দেবে। না হলে তো পাখিটির খুবই কষ্ট হবে। সাতপাঁচ ভেবে সে খাঁচার কাছে আসে। কিন্তু পাখির সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করে ফেলল। তাই সে প্রতিজ্ঞা করল। যেভাবেই হোক এই পাখিটাকে হাতছাড়া করা যাবে না। মাহির সারাদিন ওই ময়নার সঙ্গেই বসে থাকে। মুখে খাবার তুলে দেয়। গোসল করিয়ে দেয়। ময়নাও তাকে চিনে ফেলেছে। সারাক্ষণ মুগ্ধ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে দৃষ্টির রহস্য মাহির টের পেয়ে যায়। পাখিটি এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য হাজারো বাহানা খুঁজবে। সেদিকটায় মাহির খুব সতর্ক। ময়নাটি মাহিরকে বলে-
- তুমি স্কুল থেকে দ্রুত আসতে পারো না?
- কেন, আমাকে ছাড়া কি তোমার একটুও ভালো লাগে না?
- আমারও ইচ্ছে হয় তোমার সঙ্গে স্কুলে যেতে। তোমার কাঁধে চড়ে পাড়াপড়শি চক্কর দিয়ে আসতে!
- মা তো তোমাকে নিয়ে যেতে দেবে না। তবে মা আর বড় আপু যে সময় বাজারে যাবে, সে সময় তুমি আর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দূরে কোথাও ঘুরে আসব!
পাখিটি মাহিরের কথায় রাজি হয়ে যায়। মাহির এমনিতেই ময়নার প্রতি আকৃষ্ট। তার ওপর ময়না মাহিরের কাছে কত বায়না ধরে রেখেছে। তা দেখে ময়নার প্রতি মাহিরের খুব একটা মায়া পড়ে যায়। তার মনে চায় ময়নাটিকে কাঁধে নিয়ে স্কুলে যেতে। কিন্তু তার বাবা-মা তাকে বারণ করে দিয়েছে। অথচ ময়নাটি তাকে কত ভালোবাসে। তার কাঁধে চড়ে ঘুরতে বের হওয়ার ইচ্ছে করে। আরো কত বায়না ধরে প্রতিনিয়ত। কিন্তু বাবা-মায়ের চাপে তা আর হয়ে উঠে না। এক দিন মাহির শুনতে পেল মাহিরকে স্কুলে পাঠিয়ে তার বাবা-মা নাকি নানুর বাসায় বেড়াতে যাবে। ক্লাস শেষ হলে আবার মাহিরকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসবে। মাহির এই সুযোগকে কাজে লাগায়। মাহিরের বাবা যখন বাজারের সামনের পথ ধরে তাকে স্কুলে দিয়ে আসে। তখন সে স্কুলের পেছনের পথ ধরে বাড়িতে ফিরে আসে। দরজায় তালা ঝুলছে। কিন্তু এ মুহূর্তে সে কি করবে বুঝতে পারছে না। তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সে করিডরমুখী হয়ে খাঁচায় হাত দিয়ে পাখিটিকে কোলে তুলে নিল। খুশিতে সে ময়নার গায়ে বারবার চুমু খাচ্ছিল। তখন ময়না বলল-
- আমাকে কি তোমার কোলেই রেখে দেবে। পাখিকে কেউ কি কোলে করে নিয়ে ঘুরতে যায়? পাখিকে কাঁধে নিয়ে ঘুরতে হয়। সুতরাং তুমি আমাকে তোমার কাঁধে রাখো। ময়নার কথামতো মাহির আলতো করে ময়নাটিকে তার কাঁধে রাখল। অমনি ময়নাটি ডানা ঝাপটে গাছের ডালে গিয়ে বসল। মাহির ময়নাটিকে ডাকল। কিন্তু ময়নাটি গাছের ডাল থেকে বলে উঠল-
- ময়নার চালাকির সামনে সবারই মাথা নত করতে হয়।
এভাবেই ময়নাটি ছলনাময়ী হয়ে মাহিরকে অবাক করে দিয়ে দিগন্তপানে উড়ে চলে গেল। মাহির হাঁটুর ভাঁজে থুতনি রেখে বসে বসে কাঁদছে। আর তার প্রিয় ময়নাটির সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা স্মরণ করছে। তার হঠাৎ মনে হলো- তার প্রিয় ময়নাটি কীভাবে অমন ছলনাময়ী হতে পারল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোথাও ময়নাটিকে দেখা যায় না। তার স্বাধীনতা সে ফিরে পেয়েছে। ভেবে কিছুটা আনন্দিত হয় মাহির। সে ময়নার স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো একত্র করে হৃদয়ের রাফখাতায় ফ্রেমবন্দি করতে থাকে। আর তার গাল চুইয়ে নির্গত হয় দুফোঁটা নোনাজল। মাহির হাঁটছে আর ভাবছে। পরাধীনতায় যেমন কোনো পাখিকে বন্দি রাখা যায় না, তেমনি কোনো মানুষকেও হয়তো তার স্বাধীনতা ছাড়া রাখা সম্ভব না।

১১ নভেম্বর, ২০২৩ দৈনিক 'প্রতিদিনের সংবাদ' পত্রিকার 'খেয়ালখুশি' পাতায় প্রকাশিত।

সরাসরি পত্রিকা থেকে পড়তে ক্লিক করুন :

পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার কপি :