শাহরাস্তি বাস কাউন্টারের সামনে দাড়িয়ে আছি। মাথা চক্রাকারে ঘুরছে। আশপাশের পৃথিবী ক্রমশই অন্ধকার হয়ে আসছে। এখন অবশ্য রাত। আহামরি অন্ধকারের ভয়ও নেই। আকাশে মস্তবড় চাঁদ। ব্যাঙ পাতার মতো চাঁদকে আঁচলে জড়িয়ে নিচ্ছে মেঘেদের দল। মনে হয় না এ আলিঙ্গন সহজে ছুটবে; কিছুটা সময় তাদের এভাবেই কেটে যাবে। ঝিঁঝিঁ পোকারা হেঁচকি তুলা সুরে ডাকছে,  নিস্তব্ধ রজনীতে তাদের ঝিঁ ঝিঁ ডাক নদীর ঢেউয়ের মতো শুনচ্ছে। 

কাউন্টারে কোন লোকজন নেই। ভেতরে একটা ছেলে বসে আছে। দেখলে অল্পবয়স্ক মনে হয়। এই ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে প্রথম সে যে কথাটি বলবে তা হলো । 

'এখন বাস নেই। শেষ বাস ছেড়ে গেছে ঘন্টাখানেক আগে। তবে আপনার যদি ইমার্জেন্সি যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে হাজীগঞ্জের গাড়িতে উঠতে পারেন। আর ইমার্জেন্সি না হলে কাল যাবেন।'

কিন্তু আমাকে দেখে সে কিছুই বললো না। দোকানের সাটার এক টানে নামিয়ে দিয়ে তালা না মেরেই চলে গেলো৷ আমি দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত তার চলে যাওয়া দেখলাম। তার ক্ষীণ ছায়া মিলিয়ে গেল রাতের ভেতর।

ঠান্ডা বাতাস বইছে। হেমন্ত মনে হয় শেষ। চারিদিকে হালকা কুয়াশার মতো শীত শীত ভাব । এখন সময় এগারোটা বেজে একান্ন মিমিট। বাস কাউন্টারের মতো জায়গা সাধারণত লোকে–লোকারণ্য থাকে। কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন। শান্ত–সমাহিত কিংবা সম্মহিত কোন জয়গা এটা। রাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটুখানি শহরটাও ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছে।

আমি এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি বলে কিছু লোক আড়চোখে তাকাচ্ছে। দু-একজন সন্দেহে আমাকে কয়েকবার পরখও করল। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে আলাপ জুড়ে দিল। তাতে অবশ্য আমার বেশী একটা অসুবিধে হচ্ছে না। বিষয়টাতে বরং একটু আনন্দই লাগছে। 

আমার এখানে আসার অবশ্য কোন কারণ নেই। তবে এখানে আমার পরিচিত একজন আছে। তাকে খুঁজতে এসেছি। ঠিকানা বলতে শুধু এতটুকুই জানি– তার বাড়ি চাঁদপুর। আর কোন তথ্য নেই। তবে শুনেছি শাহরাস্তি অনেক সুন্দর। কিন্তু রাতের চোখে সৌন্দর্য ধরা পড়ে না– তার চেয়ে বেশি ধরা পড়ে নীরবতা, আর মানুষের অনুপস্থিতির সঙ্গে মিশে থাকা এক অদৃশ্য শীতলতা।

শীতের প্রকোপ বাড়ছে। হিম হিম শীত বয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চাঁদের আড়াল থেকে মেঘ কেটে গেছে। জীবন্ত হয়ে উঠছে শাহরাস্তির পথপ্রান্তর। কোন দিকে যাওয়া যায়৷ ভাবতে ভাবতেই মনে হলো। আমিতো আসলে কিছুই চিনি না। পরবাসী মানুষ। তবে ঘুরে ঘুরে রাতটা পাড় করে দেওয়া যায়। এমন রাত্রি আমার জীবনে বহুবার এসেছে। সেবার চট্রগ্রামে রাতের ট্রেন না পেয়ে রেললাইনে ধরে হেঁটেছি সারারাত। এই পুরো রাত্রিতে বহু বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলাম। দ্রুতগামী ট্রেনের সাইরেন সেদিন বুকের ভেতরটা বজ্রপাতের মতো কাঁপিয়ে তুলেছিল।

কোনকিছু না ভেবেই একটা সরু গলিতে ঢুকে পড়লাম। এটাকে শহুরে ভাষায় গলি বললেও এখানের পরিভাষায় বলা হবে আঁকাবাকা মেঠোপথ। কিছুদূর হাটার পর মনে হলো পথ শেষ। সামনে বিস্তৃত ধানক্ষেত। একপাশে লাউয়ের মাচা। অন্যপাশে কিছু ঘর৷ সামনের ধানক্ষেতের মাঝখানে মাটির একটা উঁচু ঢিবি দেখতে পেলাম। ধান ক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে সেখানে চলে আসলাম। ঢিবিটা দেখতে ছোটখাটো একটা পাহাড়ের মতো। এখানটাতে জোছনা দেখার তীব্র আকর্ষণ জাগে। ঢিবিটার উপরে উঠে বসি।  

পুরো ধানক্ষেতজুড়ে ছেয়ে আছে কোমল মায়াবতী জোছনা। ঝাপসা দূরত্বের যতটুকু চোখে পড়ে, অদ্ভুত আকর্ষণে কেড়ে নেয় হৃদয়–মন। লাউয়ের মাচায় প্রাণীদের ভয় দেখানোর জন্য একটা কাকতাড়ুয়া লাগিয়ে রাখা হয়েছে। কাকতাড়ুয়াটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বড় বড়। অবিকল হরিণের চোখের মতো। তবে হরিণের চোখের মতো মায়া কাকতাড়ুয়ার চোখে নেই। তার চোখে কেবলই ভীতি, নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মতো হাহাকার। কাকতাড়ুয়াটা এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও তার দিকে তাকালাম। কিন্তু আমার দৃষ্টি বেশীক্ষণ স্থায়ী হলো না। চোখে জল চলে আসলো। এই জল আনন্দের, বিরহী রাতের চিত্তহরী– শীতমুখর দিনের ম্লান হাসির।    (ক্রমশ)