নিশাচরেরা যখন ঘুমানোর আয়োজন সেরে নেয়। তখন সওকতের ঘুম উড়ে যায় দুচোখের কোল থেকে। ঘুমকাতুরে হয়ে সওকত আড়চোখে চেয়ে নেয় জোছনা প্লাবিত আকাশের বুকে। মশারির ভেন্টিলেটর বেয়ে গলে আসা ফকফকা চাঁদের আলোকরশ্মি এসে পড়ছে সওকতের বক্ষদেশে। সওকত দৃষ্টি মেলে ধরে সে আলোর বুকে। সরাসরি আসমান থেকে আসা আলো আর তার মাঝে কোন আবরণ নেই। এজন্যই হয়তো তার ঘুমের ঘোর কেটে গেছে । গ্লাসে জল ঢেলে খাওয়ার মতো কোন ভয়ংকর স্বপ্নও তাকে আচ্ছন্ন করেনি , যে স্বপ্নের বিশেষ কোন থিমে ঘুম ভেঙে যাবে আর প্রবল তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হবে। তাহলে এই রাতদুপুরে তার ঘুম ভাঙার আদৌ কোন কারণ কি থাকতে পরে? অযথাই কেন তার এমন কুলক্ষী হতে হবে। ঘুমের ঘোরে কি রাতভর কাটিয়ে দেওয়া যায় না। নির্ঘুম চাঁদের রাশভারি আলোকছটায় বহু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো তাকে।
সওকত বিছানা থেকে উঠলো না। শিমুল তুলোয় বানানো তুসোখ আর মখমলি চাদর আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখলো তাকে। বালিশে মাথা গুঁজেই অযথা ঘুম ভাঙার রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করলো। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোন ব্যাখ্যা সে দার করাতে পারলো না। বাহিরে ঝিরিঝিরি বতাস বইছে৷ অশরীরী আকৃতির প্রকাণ্ড গাছগুলোর শীর্ষচূড়া সওকতের চোখে পড়ে। বাতাসের দ্যোতনায় গাছের চূরাগুলো ক্ষিপ্র গতিতে দোল খাচ্ছে। সওকতের নাকে এসে লাগছে ওপাশের বুনোফুল আর কুমড়ো পাতার ঘ্রাণ। হুরমুর করে একদলা দমকা হওয়া এসে ঝাপটে ধরলো সওকতকে। তাদের ঘরখানা বিশাল গজারি বনের একপ্রান্তে। তারপর এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে এক নদী। যার দুই ধারে বান্ধা আছে কিছু নৌকা৷ নদীরও কোন নাম নেই। আর নৌকারও বুঝি কোন মালিক নেই। শতাব্দী পূর্বে কেউ হয়তো বাস করতো এই নদীর তটে। প্রায়ত হওয়ার পর কেউ হয়তো এই গহীনতায় আর ডুবতে আসেনি। এতদূর থেকেও তার উচ্ছল তরঙ্গের স্বরধ্বনি ভেসে আসে। রাত্রি হলেই সে সুর এক অদ্ভুত মূর্ছনা তৈরি করে প্রকৃতিতে। দিনের বেলাতেই কেমন গা ছমছমে পরিবেশ থাকায় সেদিকে বেশ একটা যাওয়ার সুযোগ হয় না কারোরই। নানান শঙ্খচিল, পেঁচারা উড়ে বেড়ায় সে আকাশের ত্রিসীমায়৷ তাই এই বনটাকে অশুভ মনে হয় সবার কাছেই। সওকতের দাদি মাঝেমধ্যে হালকা ভেতরে গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে বাশের খাঁচায় গজারি পাতা তুলে আনে। উনুন উন্মুখ হয়ে থাকে সেগুলো গ্রাস করে নিতে।
সওকতের ভাইয়েরা জনা তিনজন। এই সংসারে কোন মেয়ে সন্তান জন্ম হয়নি আজও। সওকত তাদের বড়। মেজো সানজিদ শহুরে এক কোম্পানিতে চাকরির বন্দোবস্ত করছে। আর ছোট সালমান শহরের একটা মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করে। সওকতের বিয়ের জন্য কথা উঠছে পরিবারে। অথচ সালমানটা আজকাল বিয়ের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে আছে। পরিবারের কথায়- পড়াশোনা শেষ করে, চাকরি নিয়ে, নিজের একটা অবস্থান তৈরি করেই না হয় পড়ে বিয়ে। কিন্তু সওকতের আচমকাই মনে হলো তার পূর্বেই বোধহয় ছোট ভাইটার বিয়ে হয়ে যাবে।
সালমানের ধারণা- বিয়ে-শাদিকে আজকাল আমরা কঠিন করে ফেলছি। নিজেদের ছেলেদেরকে গুনাহের দিকে ঠেলে দেওয়াতে আমাদের কোন বোধ নেই। অথচ বৈধ উপায়ে ছেলেকে বিয়ে দিতে আমাদের হাজারটা আপত্তি। যে করে হোক সে বিয়ে করবেই। অন্যথায় একটা না একটা অঘটন ঘটাবেই। আজকাল সালমানটাকে নিয়ে সওকতেরও খুব করে ভাবতে ইচ্ছে করে। এই মাঝরাত্রিরে বিছানায় রেখেই সওকতের মনে হলো- তার ছোট ভাইয়ের কথাগুলোই যুক্তির উর্ধ্বে । এই যে মানুষের ঘাড়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটা ভূত কোত্থেকে যে উদয় হলো, তা ভেবে পায় না সওকত৷
অথচ আজকাল ছেলেমেয়েরা কত স্বভাবিকভাবেই না মেলামেশা করে বেড়াচ্ছে রাস্তাঘাটে। তাতে কারো ভাবান্তর হয়না । যেন এটাই যুগের স্বাভাবিক পদ্ধতি। কোন ছেলের গালফ্রেন্ড থাকলে যেন সংসারের চিন্তা নেই৷ অথচ বিয়ের কথা উঠলেই বউকে খাওয়ানোর নানান প্রশ্ন উঠে আসে মগজ থেকে।
সালমানের পাগলামির কারণেই কিনা সেদিন সওকতের বিয়ের ব্যাপারে কথা উঠলো। বত্রিশ বছরের একটা ছেলেকে বিয়ে দিতে হবে, এটা যেন কারো মাথায়ই নেই। সওকতের বাড়িতে তার বিয়ের কথা উঠতেই তার কাছে মনে হলো, 'তার যৌবন ফুরিয়ে গেছে। বিয়ে করার যোগ্যতা হয়তো আর নেই তার ।' সালমানকে বিয়ে দিতে হলে সামাজিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে সওকতকে আগে বিয়ে দেওয়া উচিত। তারপর না হয় ছোট ছেলেটার ব্যাপারে একটা রফদফা হবে। বিয়ে সংক্রান্ত এসব ঝামেলা নিয়েই সওকতের পরিবারের দিনে দহনে বাড়ছে । সঠিক কোন সিন্ধান্তে কেউই পৌঁছুতে পারছে না।
সওকত ঘুম ভাঙার রহস্য খুঁজে পেয়েছে। টিউবওয়েল থেকে রাতভর টিপ টিপ পানি ঝরছে। তার পতিত হওয়ার শব্দের সাথে মিহি সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশজুড়ে। সওকত অনেকক্ষণ চেষ্টা করলো, কিন্তু বন্ধ করতে পারলো না । সামান্য পানি বিলানো কলও আজকাল ঝরণামালা হয়ে প্রবাহিত হতে চায়। কত শখই না জাগে প্রকৃতির বুকে।
সওকত ঘুমের জন্য পুনরায় প্রস্তুতি নিলো। বৃষ্টি নামার সমূহ সম্ভাবনা দেখে জানালার কপাট ভেজাতে উদ্ধত হলো। আর তখনই দৃশ্যটা চোখে পড়লো তার। মেরুন রঙের পাঞ্জাবি পড়ে কে যেন আলগোছে বনের দিকে হেটে যাচ্ছে। সে দৃশ্যে সওকতের শিরা-উপশিরাগুলো সঠান হয়ে উঠে। গা ছমছমে অনুভূতি টের পায় গভীর থেকে।
দুই.
ফজরের আগে সওকতের বাড়িতে হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেলো। সালমানকে সওকতের বাবা ফজর পড়ার জন্য ডাকতে গিয়ে দেখলেন ছেলে উধাও। রাত্রিবেলায় এখান থেকে শহরের দিকে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। দিনের বেলাতেই মানুষ কুঁকড়ে থাকে যানবাহনের অভাবে। আর রাতের বেলায় কি না সালমান উধাও। সওকতের তখন গতরাতের কথা স্বরণ হলো। ঐ মেরুন রঙের পাঞ্জাবি পড়া ছেলেটা কি তাহলে সালমান। চাঁদের ঝাপসা আলোর কথা যতটুকু স্বরণ হলো- সওকতের কাছে মনে হলো, ঐটা তার ছোটো ভাই সালমান। নিশ্চয় নতুন কোন ঝামেলা পাকানোর জন্য নিজেকে শক্তভাবে তৈরি করছে সে। আর এতে সে সফলও। সওকতের একবার ইচ্ছে হলো সবাইকে গতরাতের ঘটনা খুলে বলা উচিত। কিন্ত পরোক্ষণেই মনে হলো। বড় ভাই হিসেবে বিয়ের জন্য তাকে তার মতো পাগলামি করতে দেওয়া উচিৎ। কিন্তু কোথায় গেলো না গেলো তা নিয়ে তার খুবই টেনশন হতে লাগলো তার । ঐদিকটায় কোনদিন কাউকে যেতে দেখা যায়নি। আজ অব্দি কেউ ওদিকে যাওয়ার মতো সাহস করে উঠেনি।
সবাইকে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মনে হলো। সবাই নিরুত্তাপ। কেউ কারো সাথে বেশী একটা কথা বলছে না । সালমানের নিখোঁজতা সবাইকেই কমবেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে রেখেছে। এসব দেখে সওকতের বুক ধক করে উঠলো।
তিন.
অন্ধকারের ধূম্রজাল পেড়িয়ে কিছুদূর হাঁটার পর সালমান আলোকিত একটা জায়গায় বসলো। গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে আশপাশটা একটু পরখ করে নিলো। নাহ, কোন ভয়ংকর প্রাণী কিংবা সন্ত্রাস জাতীয় কোন চক্র চোখে পড়লো না। গাছগাছালির ফাঁকফোকর বেয়ে চাঁদের ঝাপসা আলো এসে গলে গলে পড়ছে বনের অভ্যন্তরে। খানিক আগে এদিকটায় সামান্য বৃষ্টি হয়েছিলো বোধহয়, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে ঠেকছে। আরো অজানা কিছু তাজা সুভাসের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। সালমান এতো সৌন্দর্য কখনো পর্যন্ত দেখেনি। কি সব আজেবাজে কথাই না শুনেছে এই বনের ব্যাপারে। অথচ কত আকর্ষণ তার গভীরে কেউ টেরও পায়না কখনো। এরূপ প্রকৃতির আঁচলে মুখ লুকিয়ে এক জনম পাড় করে দেওয়া যাবে।
প্রত্যতুষের দেখা পেলেই অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। যেদিকটাতে কেউ খুঁজে পাবে না তাকে। হাঁটতে হাঁটতে খুঁজতে থাকবে জীবনের পাথেয়। অনেককিছুইতো শেখা হলো, এখন না হয় প্রকৃতির কোল থেকে সামান্য শিক্ষা নেওয়া যাক। কিছু কালো বাদুঁড়ের উড়োউড়িতে পরিবেশটা একটু ভুতূরে মনে হলো সালমানের কাছে। এখন বোধহয় সুবহে কাজিব। কিন্তু বনের গভীর থেকে সেটা টের পাওয়া সম্ভব না। হয়তো সকাল হলেও দেখা যাবে এখানে অন্ধকার। সালমানের চোখ লেগে এসেছিলো, হঠাৎ কারো হুঁচট খেয়ে পড়ে যাবার শব্দ শুনে তার ঘুমে আগাত হানলো সে শব্দ । তার উচিত ছিলো, ঘাবড়ে যাওয়া বা সতর্ক হওয়া । কিন্তু সালমান শান্ত প্রকৃতির মানুষ, এতো সহজে হতচকিত হওয়ার মানুষ সে না। তার অনুসন্ধিৎশু দৃষ্টি পেছনে ঘুরে ফিরলো। গাছের ফাঁকফোকর বেয়ে আসা সুবহে সাদিকের কিছুটা ঝাপসা, অস্পষ্ট আলোয় দেখতে পেলো ষোলো কিংবা বছরের একটা মেয়ে উল্টো হয়ে পড়ে আছে৷ সালমান মেয়েটিকে উঠে বসালো। জিজ্ঞেস করলো তার পরিচয়। কিন্তু মেয়েটি তাকে কিছু বলতে আগ্রহবোধ করলোনা। শুধু বাঁ দিকে ইশারা করে বললো,
'ওরা আসলে বিপদ, আমাকে নিয়ে দ্রুত এখান থেকে পালান। '
সালমান বুঝলো, ভয়ংকর কোন চক্রে পড়েছ মেয়েটি। তাকে নিয়ে আপাতত কেটে পড়াই ভালো। হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো নদী পর্যন্ত চলে এসেছে তারা। সামান্য দূরেই নদী থেকে থেকে ভেসে আসছে তার কল্লোল ধ্বনি। জীবনে প্রথমবার সে এই নদী দেখলো। বড় শান্ত প্রকৃতির সাথে জুড়ে আছে সে। সবুজাভ প্রকৃতির কোলে নিজেকে মেলে ধরেছে রমণীয় সাঝে। মানুষের আনাগোনা কম হওয়ার কারণেই বোধহয় এখানের সবুজতাটা চোখে পড়ার মতো।
মেয়েটির সাথে অনেক বিষয় নিয়েই সালমানের কথা হলো। সংক্ষেপে বলতে গেলে তার পরিস্থিতি হল এমন - তার বাসা ঢাকার গুলশানে। নামি-দামি একটা ফ্ল্যাট বাসায় থাকে সে। সেখান থেকে কিডন্যাপিং হয়েছে সে। দুদিন খুব কষ্ট দিয়ে তাকে আটকে রেখেছে। সামান্য কিছু খাবারও জুটেছে তার ভাগ্যে। কিন্তু তা ছিলো অখাদ্য। তবুও পেটের দায়ে তাকে সেগুলো ভোগ করতে হয়েছে। তাকে ধরে আনার উল্লেখযোগ্য কোন কারণ সে বলতে পারলো না। তার বাবার নাম্বার চাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু বাবার কষ্ট হবে বলে সে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ৷ মোবাইলটাও কোথায় যেন পড়েছে, তারা খুজে পায়নি।
আশপাশে দেখা গেলো বৃহদাকৃতির পুরোনো কিছু নৌকা ভাসছে। এই পুরোনো নৌকাগুলোর মাঝেই ঐ চক্রের ঘাঁটি। তাই সালমান পথ পরিবর্তন করার সিন্ধান্ত নিলো। আড়চোখে মেয়েটি সালমানের দিকে একবার তাকালো। তারপর বিস্ময় চোখে সালমানকে বললো,
'আপনি আমাকে এখানে আনলেন কেন? নাকি আপনিও ঐ দলের সাথে যুক্ত। না হয় এতো রাতে গভীর জঙ্গলে আপনার কি কাজ থাকতে পারে। '
সালমান হতভম্ব মেয়েটির দিকে তাকালো। এই প্রথম স্পষ্ট তার চেহারাটা দেখলো সে। অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে। চোখের কাজল মাখামাখি হয়ে আছে। মেকাপ করে বাসা থেকে বেড়িয়েছিলো বোধহয়। সালমান বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলোনা। ভীষণ লজ্জা পেয়ে কুঁকড়ে গেলো সে। মেয়েটিও সেটা বুঝতে পেরে তাকে ক্ষমা করলো। তার নাম তুলি। কলেজে পড়াশোনা করে।
' আসলে আমি ঠিক কি করে উঠবো বুঝতে পারছি না, আপনি কিছু মনে করবেন না। '
'না, অসুবিধা নেই। আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি।'
'মানে?'
'মানে বাড়ি থেকে আমাকে বিয়ে দিচ্ছে না, তাই বেড়িয়ে পড়েছি।'
'ও আচ্ছা। এই তাহলে ব্যাপার। আচ্ছা, এখন তাহলে এই জঙ্গলে এসে বিয়ের পথ খুঁজছেন?'
সালমান একথা শুনে থমকে যায়। মেয়েটির সাথে নানান কথা বলে বন্ধুত্বসূলভ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই যাচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে সময়ে-অসময়ে। কখন কি বলতে হবে সে কাণ্ডজ্ঞানে তার কিছু ত্রুটি আছে।
'যেদিকে দুচোখ যায়, আপাতত সেদিকেই যাচ্ছি।'
'আচ্ছা, চলতে থাকুন আমি আপনার সাথে আছি। আসলে কি জানেন। এই জঙ্গলে আসার পর থেকে কেমন যেন প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়েছি। কি আবদ্ধ জীবনটাই না কাটাই আমরা। অথচ পৃথিবী অমন স্নিগ্ধতা এখানে না আসলে বুঝতামই না। নানান ফুলের সুভাস। পাখপাখালির ডানা ঝাঁপটানোর ভুতূরে শব্দ, সবকিছুতেই একটা হাহাকার খুঁজে পেয়েছি এতোদিনে। ওরা যখন আমাকে বেঁধে ফেলে রেখেছিলো, তখন মাটি থেকেও সুগন্ধি পাচ্ছিলাম। কি যে ভালো লাগছিলো তখন।'
'তাহলে কি ভেবেছেন, বাকি জীবন এই জঙ্গলেই কাটিয়ে দিবেন?'
'আপাতত এরকমই ভাবনা! '
সালমান নদীর আশপাশ থেকে কিছু ফলফ্রুট সংগ্রহ করলো। এক কিনারায় বসে দুজন নদীর উচ্ছল তরঙ্গ দেখতে দেখতে সেগুলো খেতে লাগলো । অনেকক্ষণ বসে বসে তারা জীবনের নানান অনুষঙ্গ নিয়ে গল্পগুজবে মেতে উঠলো। তারপর আবার উঠে হাঁটতে থাকলো অজানার কোন পথে৷ আকাশ তখন ভীষণ মেঘলা। সারাক্ষণই বাতাস বইছে চারপাশে। সে বাতাসের সুর কেমন বিষন্ন ঠেকে তাদের কাছে।
'এক কাজ করুন, আপনি আমাকে নিয়ে আপনার বাড়িতে চলুন। আমি আপনার জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করবো।'
'তা কিভাবে? '
'সেটা না হয় পড়েই জানা যাবে। '
তুলি লক্ষ্য করলো সালমানের সাথে যখন থেকে তার দেখা হয়। তখন থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত ঐ একবারের বেশী সে তার দিকে তাকায়নি। বিষয়টা খুব ভালো লাগে তুলির কাছে। অথচ ঢাকা- শহরে কত মানুষ তার দিকে ডেবডেব করে চেয়ে থাকে। বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছু লোক। কি ভয়ংকর দৃশ্য। অথচ মেয়েরা এটাকেই নাকি ফ্যাশন বলে৷ রাস্তাঘাটে হাঁটলে সবাই তাকে দেখবে৷ এতে কি সুখ পায় মেয়েরা। এসব ভেবে পায়না তুলি। কিন্তু পর্দার মধ্যে নিজেকে জড়ানোর কোন পথও সে খুঁজে পায়নি কখনো। ইসলামের বিধিনিষেধ সম্পর্কে পারিবারিক অসচেতনতাই এর মূল কারণ ঠেকে তুলির কাছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই সালমান তুলিকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। পেছনে ফেলে আসে সবুজ প্রকৃতির কোলে খরস্রোতা এক নদী।
চার.
বাড়ির উঠোনে ভীড় জমে আছে। সবাই একত্রিত হয়ে সালমানকে দেখছে। সরলমনা একটা ছেলে উধাও হয়ে আবার উপস্থিত। সেটা সবাইকে বেশী একটা কাবু করছে না৷ সবাই বিস্মিত হয়ে আছে সালমানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তুলিকে দেখে। কি মায়াবী চেহারার একটা মেয়ে। চারপাশে মুগ্ধ ছড়াচ্ছে যেন। সওকত বই পড়ছিলো, কারো সাড়াশব্দ না পেয়ে উঠোনে আসলো সেও। মোটামুটি একটা জনসমাগম বলা যেতে পারে। কৌতূহলী হয়ে সওকত জটলার মাঝখানে আসলো। সালমান আর তুলিকে দেখে একটা মুচকি হাসি দিলো সে।
'আরে, সবাই এভাবে কি দেখছো? ভাবিকে বসতে দাও আগে। ঐ মা! তাদের জন্য নাস্তা রেডি কর। '
বলেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে হেঁটে গেলো সওকত। সালমান সওকতের মুখ থেকে এসব শুনে বুঝে গেলো৷ একটা বড়সড় ঝামেলা হতে যাচ্ছে। কিন্তু সবার তীর্যক দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে কাউকে কিছু বলতে পারছে না সে । তাদেরকে আরেকটুখানি ভরকে দিতে সালমান তুলিকে 'তুমি' সম্মোধন করে বসতে বললো। এসব দেখে সবার চোখই ছানাবড়া।
সালমান রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ সংক্ষিপে তুলে ধরলো৷ তুলি তার কথা বলে সালমানকে বিবাহ দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিলো কিছুক্ষণ। কিন্তু সবার কাছেই তারা দু'জন রূপকথার গল্প হয়ে থাকলো। কারো কানই যেন তাদের এ সোজাসাপ্টা কথাগুলো হজম করতে চাইলো না। সওকত ঘটনার বিবরণ শুনে ভীষণ লজ্জা পেলো। অথচ তুলিকে সে 'ভাবি' সম্মোধনও করে ফেলেছে।
পরিশিষ্ট :
তুলি খানিকটা অসুস্থবোধ করলো। তাই টানা সাতদিন সে কারো সাথে বেশী একটা কথা বললো না। কিন্তু সওকতের মায়ের সাথে আজকাল তার বেশ সখ্যতা গড়ে উঠছে৷ সালমানকে বিবাহ দেওয়ার ব্যাপারে তুলি উৎসাহী করে তুললো তার পরিবারকে। কিন্তু এই উৎসাহ দিতে গিয়ে সে নিজেই ফেঁসে গেলো সালমানের বিবাহের জালে। এই গহীন জঙ্গলের পাশেই থেকে যেতে হবে চিরকাল।
সওকত সেই জানালার কাছেই বসে আছে। আকাশে আজও মস্ত বড় চাঁদ। ঐদিন এদিকটাতেই সালমানকে দেখেছিলো সে। বেচরা জঙ্গল কেন গিয়েছিল? ভেবে পায়না সওকত। অথচ জঙ্গল থেকে এসেই তার বিয়ে হয়ে গেলো। সওকত ভাবলেশহীন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই আকাশে কত রঙবেরঙ মেখে তারারা জ্বলে উঠে। আকাশের বুকে তাকিয়ে সওকত মনে মনে ভাবলো - তার আরো আগেই জঙ্গলে যাওয়া উচিত ছিলো। আজ যে তার যৌবনটাই ফুরিয়ে যাচ্ছে। আলগোছে কেটে যাচ্ছে দিন-দুপুর, সন্ধ্যা।
